Hamidul Haque
১৬ জুন ২০২৫, ৪:৩৬ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

২০২৫ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবই ছাপায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহৃত হয়েছে।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য নিম্নমানের কাগজে ছাপা পাঠ্যবইয়ের কারণে অনেক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বই ভেঙে পড়া সমস্যায় ভুগছে। প্রেস মালিকদের একটি অসাধু চক্র অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনসিটিবি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও একই ধরনের মানহীন বই ছাপার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অনলাইন ডেস্ক : অনিয়মের পাশাপাশি নিম্নমানের কাগজে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছেপে শতকোটি টাকা অতিরিক্ত লোপাট করেছে প্রেস মালিকদের অসাধু চক্র। তাদের অপকর্মে পাঁচ মাস পেরোনোর আগেই কিছু অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের জন্য বাকি মাসগুলোয় এসব বই পড়া কষ্টকর হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষেও মানহীন বই ছাপার প্রস্তুতি নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড-এনসিটিবি।

এ জন্য দরপত্র প্রকাশের পর তাতে সংশোধনী আনা হয়েছে। এবার এই বই ছাপায় বাজেট রয়েছে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি প্রাক-প্রাথমিক বইয়ের জন্য দরপত্র প্রকাশ করে এনসিটিবি। তাতে ৪৫ কোটি টাকার কাজে ২২.৭৫ ও ৩৩.৫ ইঞ্চি ওয়েব মেশিন থাকার শর্ত দেওয়া হয়।

কিছুদিন পর তাতে সংশোধনী এনে মেশিনের আকার যথাক্রমে ২২ ও ৩২ ইঞ্চি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা বলছেন, এই আকারের মেশিনে সঠিক মাপের বই করা সম্ভব নয়। ছাপাও সঠিক হবে না। তাতে আবারও মানহীন বই পাবে শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রেস মালিকদের অসাধু চক্র কাজ পেতে কয়েক কোটি টাকার তহবিল তৈরি করে। পরে চক্রটি এনসিটিবিকে মেশিনের আকারে সংশোধনী আনার চাপ দেয়। এই বই যেহেতু প্রাথমিকের, তাই এনসিটিবি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অন্যদিকে প্রেস মালিকদের ওই চক্র বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে অধিদপ্তরকে সন্তুষ্ট করে। এতে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংশোধনী আনার পক্ষে মত দেন।

এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আবু নাসের টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সঠিক মানের বই পাওয়ার জন্য উপযোগী মেশিনের মাপ দিয়েই দরপত্র আহবান করেছিলাম। তিনটি কম্পানি প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়। এখন আরো বেশি কম্পানিকে সুযোগ দিতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর থেকেই মেশিনের মাপে পরিবর্তন আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে আমরা দরপত্রে সংশোধনী আনি।’ জানা গেছে, আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রব্বানি জব্বার পতিত সরকারের দুই দফার এক পূর্ণ মন্ত্রীর ছোট ভাই। এমনকি রব্বানি জব্বারও নেত্রকোনার এক উপজেলায় চেয়ারম্যান ছিলেন। পতিত সরকারের আমলে তিনি একচেটিয়া বইয়ের কাজ করেছেন। এখনো তিনি তাঁর কর্তৃত্ব ধরে রেখেছেন। তাঁকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সক্ষমতার বেশি কাজ দেওয়া হয়। মানহীন বই ছাপার অভিযোগে তাঁর প্রেসের ২০ হাজার বই কেটে দেয় এনসিটিবি। এবারও তিনি কাজ পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। গত ৫ আগস্টের পরও তিনি বাংলাদেশ মুদ্রণ সমিতির সভাপতির পদ ছাড়েননি। সমিতির আরো কয়েকজন ঊর্ধ্বতন নেতা তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন। কথা বলার জন্য রব্বানি জব্বারকে ফোন দিলে এমনকি এসএমএস পাঠালেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।

সম্প্রতি এনসিটিবি ৩২টি টিম ৬৪ জেলায় পাঠায়। টিমগুলো দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বই সংগ্রহ করে দেখতে পায় ৩৩ শতাংশ বই নিম্নমানের। ৪০ কোটির মধ্যে ১৩ কোটি বইয়ের মানই খারাপ। এসব বইয়ে জিএসএম, ঔজ্জ্বল্য, বাঁধাই—কিছুই ঠিক নেই। নিম্নমানের এসব বই দিয়ে শতকোটি টাকা অতিরিক্ত লোপাট করেছে ওই অসাধু চক্র।

বই ছাপার পর মান যাচাইয়ের জন্য হাই-টেক সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসকে নিয়োগ দেয় এনসিটিবি। প্রতিষ্ঠানটিও মাঠ পর্যায়ে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করে। তাদের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, লেটার এন কালার লি. সবচেয়ে বেশি নিম্নমানের বই দিয়েছে। তারা ৮০ জিএসএমের পরিবর্তে অতি নিম্নমানের ৬৯ ও ৭০ জিএসএমের কাগজ ব্যবহার করেছে। অনুপম প্রিন্টার্স ৭০ জিএসএমের পরিবর্তে ৬১ জিএসএম, অক্সফোর্ড প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন ৮০ জিএসএমের পরিবর্তে ৭৩ জিএসএম, দ্য গুডলাক ৮০ জিএসএমের পরিবর্তে ৭১ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করেছে।

লেটার এন কালার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী শেখ সিরাজউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ৭০ ও ৮০ উভয় জিএসএমের কাজই করেছি। এ ক্ষেত্রে কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে ওলট-পালট বা ভুল হতে পারে। এনসিটিবি আমাদের চিঠি দিয়েছে। আমরা বইগুলো রিপ্লেস করে দিচ্ছি।’

হাই-টেকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭০ জিএসএমের পরিবর্তে শাফিন প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন ৫৯ জিএসএম, সুবর্ণা প্রিন্টার্স ৫৫ জিএসএম, অ্যারিস্টোক্র্যাটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং ৫৬ জিএসএম, বর্ণমালা প্রেস ৫৮ জিএসএম, ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস ৬৩ জিএসএম, বর্ণমালা ৬০ জিএসএম, দোয়েল প্রিন্টার্স সাড়ে ৬৫ জিএসএম, রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন ৬৫ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করেছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরই মধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে তাদের দেওয়া নিম্নমানের বই রিপ্লেস করে দিতে চিঠি দিয়েছি। যদি তারা তা না নেয়, তাহলে তাদের জমা রাখা ২০ শতাংশ অর্থ কেটে নেওয়া হবে। এ ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিকের দরপত্রে সংশোধনীর ব্যাপারে চেয়ারম্যান বলেন, ‘মেশিনের প্রকৃত মাপ দিয়েই আমরা দরপত্র আহবান করেছিলাম। কিন্তু ১১৬টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান সংশোধনীর জন্য চিঠি দেয়। অধিকসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এ ব্যাপারে সায় দেয়। তবে তাদের আমরা স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বই দিতে বলেছি। তারা বলেছে পারবে। তাই সংশোধনী আনা হয়েছে।’

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সফটওয়্যার আপডেটে আইফোন নাকি পিক্সেল—কোন স্মার্টফোন এগিয়ে?

হুথিদের লক্ষ্য করে ইয়েমেন সরকারের হামলা

বিরোধীদল হয়েই আ.লীগের সমস্ত বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে জামায়াত: রাশেদ

প্রতি রাতে ৩০-৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করতে বললেন ইসরাইলি মন্ত্রী

সিনেমায় ৫১ বছর পূর্ণ করলেন রজনীকান্ত

ডলার দুর্বল হওয়ার প্রভাব স্বর্ণের দামে

বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ, হাসিনার ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে

এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন শুরু, চলবে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত

‘অবৈধ যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প, বেরিয়ে আসার পথ পাচ্ছেন না’

দেশে স্বর্ণের দাম ফের বাড়ল

১০

পেশা নিয়ে অপপ্রচার, আওয়ামী কর্মীদের উদ্দেশ্যে যে বার্তা দিলেন তাসনিম জারা

১১

গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ লাশ উদ্ধার, বেশিরভাগ নারী-শিশু

১২

ব্রাজিলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ৪

১৩

মানবসেবার জন্য রোটারির সম্মানজনক পদক পেলেন ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন

১৪

হরমুজ খোলার আশায় বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম

১৫

মোদি এখন দুর্বল, এবার বড় আন্দোলনের সতর্কবার্তা দিলেন সোনাম ওয়াংচুক

১৬

অস্ত্র নিয়ে তথ্য ফাঁসকারীদের খুঁজছেন ট্রাম্প

১৭

দেশে স্বর্ণের দামে বড় লাফ

১৮

যুদ্ধবিরতির উদ্যোগের মধ্যেও গাজায় ইসরাইলি হামলা, নিহত ৮

১৯

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ইসির সাংবিধানিক এখতিয়ার: সালাহউদ্দিন আহমদ

২০