News Editor
৭ জানুয়ারী ২০২৬, ৬:৪২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা ফলে কি তাইওয়ান দখলে উদ্বুদ্ধ হবে চীন?

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী গত সপ্তাহে যখন ভেনেজুয়েলা আক্রমণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছিল, ঠিক সেই সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো চীনের লাতিন আমেরিকা বিষয়ক শীর্ষ দূতের সঙ্গে ছবি তুলছিলেন এবং বেইজিংয়ের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে চীনা কূটনীতিক চিউ শিয়াওচির সঙ্গে সাক্ষাতে মাদুরো বলেন, ‘একজন বড় ভাইয়ের মতো অব্যাহত ভ্রাতৃত্বের জন্য আমি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ধন্যবাদ জানাই।’

এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা রাতের আঁধারে মাদুরোকে তার শয়নকক্ষ থেকে তুলে নিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে লাতিন আমেরিকায় তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্রকে হারায় বেইজিং।

চীন-ভেনেজুয়েলা বন্ধুত্ব

চীন ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি পারস্পরিক অনাস্থা এবং রাজনৈতিক আদর্শের মিলের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক ২০২৩ সালে ‘সব-আবহাওয়ার কৌশলগত অংশীদারত্বে’ রূপ নেয়। এর মাধ্যমে বেইজিং অর্থনৈতিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন বাড়িয়ে কারাকাসকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে নিজেদের বলয়ে টেনে নেয়।

ভেনেজুয়েলার অধিকাংশ তেল রপ্তানি যায় চীনে। পাশাপাশি দেশটির অবকাঠামো খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও ঋণের পরিমাণও কয়েক বিলিয়ন ডলার। তবে মাদুরোকে বন্দি করার মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ চীন-ভেনেজুয়েলার সেই সম্পর্ককে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলার তেলে চীনের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার এবং অঞ্চলজুড়ে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

চীনে তীব্র প্রতিক্রিয়া

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় বেইজিং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওয়াশিংটনের কড়া সমালোচনা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের পুলিশ’ সুলভ আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। একই সঙ্গে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন তোলে।

চীনের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম উইবোতে ট্রাম্পের এই অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় কোটি কোটি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তোলেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের ‘পেছনের উঠানের’ কোনো দেশের নেতাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে, তবে চীন কেন তাইওয়ানের ক্ষেত্রে একই পথ অনুসরণ করতে পারবে না?

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে, যদিও দ্বীপটিকে তারা কখনো শাসন করেনি। বেইজিং বহুবার বলেছে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করেই তাইওয়ানকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক মহড়া ও অবরোধের মহড়াসহ চাপ বাড়িয়েছে চীন।

তবে অনলাইনে জাতীয়তাবাদী উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ের সুর ভিন্ন। চীন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে ‘আধিপত্যবাদী আচরণ’ আখ্যা দিয়ে মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক বৈঠকে ‘একতরফা দাদাগিরি’র সমালোচনা করে বলেন, এসব আচরণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম শিনহুয়া এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘নিয়মনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’র ভণ্ডামির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। পাশাপাশি, পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট সামরিক সক্ষমতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দেয়।

তাইওয়ানে হামলা করবে চীন?

তবে তাইওয়ানে বিষয়টি নিয়ে তেমন আতঙ্ক নেই। তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা ওয়াং টিং-ইউ বলেন, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর তাইওয়ানও ভেনেজুয়েলা নয়। এই তুলনা ভুল ও অনুচিত।’ তার মতে, চীনের শত্রুতার অভাব নেই, কিন্তু কার্যকর সামরিক পথই তাদের বড় সীমাবদ্ধতা।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা অভিযান চীনের তাইওয়ানসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সরাসরি বড় পরিবর্তন আনবে না। বেলজিয়ামভিত্তিক থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, চীনের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সামরিক সক্ষমতা, তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ওয়াশিংটনের নীতির ওপর।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে— পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনে সামরিক পথ বেছে নেওয়া বিশ্বব্যাপী একটি নতুন স্বাভাবিক প্রবণতায় পরিণত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের উচিত নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রতিরোধ শক্তি আরও জোরদার করা।

লাতিন আমেরিকায় চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর অপসারণ বেইজিংয়ের জন্য বড় ধাক্কা হলেও অঞ্চলটিতে বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতে চীনের বিনিয়োগ এতটাই গভীর যে, সেখান থেকে হঠাৎ সরে আসা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ফলে চীন এখন সামরিক প্রতিযোগিতার চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ধর্ম নয়, সবার বড় পরিচয় বাংলাদেশি : তারেক রহমান

১

অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে দুই বছর লাগবে : অর্থমন্ত্রী

২

চলতি মাসেই বাড়তি বেতন পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

৩

আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

৪

ইরান যুদ্ধে ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ স্বীকার জেডি ভ্যান্সের

৫

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধ্বংসী দাবানল, পুড়ল শত শত একর জমি

৬

প্রশাসনে বড় রদবদল: সাত সচিবের দপ্তর বদল

৭

পুলিশ প্রশাসনে রদবদল: ১১ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদলি

৮

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বন্দরে ‘বাংলাদেশ সনাতন সংঘ’র গীতা দান

৯

বাপার সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন

১০

বাপার সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন

১১

বিরোধীরা না থাকলেও বাস্তবায়িত হবে ‘জুলাই সনদ’ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১২

বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ : হাসনাত আবদুল্লাহ

১৩

বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চায় বাংলাদেশ

১৪

ইউনূসকে হেনস্তার সম্পূর্ণ দায় শেখ হাসিনার : জামায়াত আমির

১৫

সোনারগাঁয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার – ৩৫

১৬

৩৩ হাজার মণ্ডপে তিন স্তরের নিরাপত্তা

১৭

সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, পর্যটকদের ফেরার নির্দেশ

১৮

ন্যাটোর আদলে সক্রিয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি

১৯

জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

২০