News Editor
৫ মার্চ ২০২৬, ৫:২০ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

কে এই মোজতবা খামেনি, যার কণ্ঠস্বর শোনেননি অনেক ইরানি!

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু তেহরানের শাসনব্যবস্থায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে। এই কঠিন সময়ে দেশ পরিচালনার হাল কে ধরবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর গুঞ্জন। আর এই দৌড়ে সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠে এসেছে তার দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনির নাম।

ইরান সরকার এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও, পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি— ৪৭ বছরের পুরনো এই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পরবর্তী ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হতে যাচ্ছেন কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত মোজতবা।

উল্লেখ্য, গত শনিবার তেহরানে খামেনির বাসভবনে চালানো ভয়াবহ হামলায় মোজতবার মা, স্ত্রী এবং এক বোন প্রাণ হারান। তবে সেই সময় ঘটনাক্রমে সেখানে উপস্থিত না থাকায় মোজতবা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। দেশজুড়ে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ আর রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে মোজতবা খামেনির এই টিকে থাকা এবং তার সম্ভাব্য ক্ষমতায় আরোহণকে যুদ্ধের ময়দানে ইরানের ভবিষ্যৎ কৌশলের এক ‘নতুন মোড়’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ব্যক্তিগত জীবন ও বর্তমান অবস্থা 

৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি কখনও সরাসরি নির্বাচনে লড়েননি কিংবা জনমতের মুখোমুখি হননি। অথচ গত কয়েক দশক ধরে তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থার ‘নিউক্লিয়াস’ বা ক্ষমতার কেন্দ্রে এক অতি-প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশেষ করে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শাখা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (IRGC) সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।

দীর্ঘ ৩৬ বছর ইরানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় থাকা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি গত শনিবার নিহত হওয়ার পর, তার শূন্যস্থানে মোজতবার নাম আসা কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তিনি ক্ষমতায় আসা মানেই হলো— ইরানের প্রশাসনে কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হওয়া এবং অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমাদের সঙ্গে যে কোনো আপস বা আলোচনার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া।

dhakapost
ইসলামী বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপনে অংশ নেওয়ার সময় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনির ছবি ধরে আছেন এক ইরানি / ছবি- সংগৃহীত

বিস্ময়কর বিষয় হলো, মোজতবা খামেনি বরাবরই নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতে পছন্দ করেন। তিনি জনসমক্ষে কোনো বক্তৃতা বা ধর্মীয় ভাষণ দেন না। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তার এই নিরবতা এতটাই রহস্যময় যে, অনেক ইরানি আজও তার কণ্ঠস্বর শোনেননি।

বিতর্ক ও রাজবংশতন্ত্রের শঙ্কা

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল রাজতন্ত্র উৎখাত করা। এখন যদি খামেনির স্থলাভিষিক্ত তার ছেলে হন, তবে তা এক নতুন ‘ধর্মীয় রাজবংশ’ তৈরির বিতর্ক উসকে দেবে— যা পাহলভি রাজবংশের সেই পুরনো স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দেয়।

বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকা

মোজতবার বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ হলো— বিক্ষোভ দমনে তার কঠোর ভূমিকা। সংস্কারপন্থীরা তার বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপি এবং আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’ ব্যবহার করে শান্তিকামী বিক্ষোভকারীদের (২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট) ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন।

মাত্র দুই মাস আগে ইরানে যে নজিরবিহীন বিক্ষোভ হয়েছে, যাতে জাতিসংঘের মতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, সেই রক্তক্ষয়ী অভিযানেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য

মোজতবা ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে আইআরজিসি-র ‘হাবিব ব্যাটালিয়ন’-এ সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। তার তৎকালীন অনেক সহযোদ্ধা বর্তমানে ইরানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ পদে রয়েছেন। এছাড়া পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ছদ্মনামে তিনি একটি বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার লেনদেন হয়। গত বছর দেউলিয়া হওয়া ‘ব্যাংক আয়ান্দেহ’-এর সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছে ব্লুমবার্গ।

ধর্মীয় পদমর্যাদা

ইরানের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে ‘আয়াতুল্লাহ’ পদমর্যাদার হতে হয়। কিন্তু মোজতবা বর্তমানে একজন মধ্যম সারির আলেম বা ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’। তবে ১৯৮৯ সালে তার বাবা যখন নেতা হন, তিনিও আয়াতুল্লাহ ছিলেন না; তার জন্য আইন সংশোধন করা হয়েছিল। মোজতবার ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসরণ করা হতে পারে।

dhakapost
ইরানের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করবে / ফাইল ছবি

বর্তমান পরিস্থিতি

দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে পরবর্তী নেতার ঘোষণা কখন আসবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। বর্তমানে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল দেশ পরিচালনা করছে। তারা হলেন— গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য আলি রেজা আরাফি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেন মহসেনি-এজেই এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

ইরানের সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, ওই তিন সদস্যসহ ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’ নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করবে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় রাষ্ট্রীয় অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের পাশাপাশি এই শক্তিশালী পর্ষদের কার্যালয়েও ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সূত্র : আল-জাজিরা।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ধর্ম নয়, সবার বড় পরিচয় বাংলাদেশি : তারেক রহমান

১

অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে দুই বছর লাগবে : অর্থমন্ত্রী

২

চলতি মাসেই বাড়তি বেতন পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

৩

আগামী ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু

৪

ইরান যুদ্ধে ‘গুরুতর ব্যর্থতা’ স্বীকার জেডি ভ্যান্সের

৫

ক্যালিফোর্নিয়ায় বিধ্বংসী দাবানল, পুড়ল শত শত একর জমি

৬

প্রশাসনে বড় রদবদল: সাত সচিবের দপ্তর বদল

৭

পুলিশ প্রশাসনে রদবদল: ১১ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বদলি

৮

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বন্দরে ‘বাংলাদেশ সনাতন সংঘ’র গীতা দান

৯

বাপার সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন

১০

বাপার সিদ্ধিরগঞ্জ আঞ্চলিক সমন্বয় কমিটি গঠন

১১

বিরোধীরা না থাকলেও বাস্তবায়িত হবে ‘জুলাই সনদ’ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১২

বিএনপির মুখে জুলাই, অন্তরে আওয়ামী লীগ : হাসনাত আবদুল্লাহ

১৩

বিশ্বব্যাংকের কাছে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চায় বাংলাদেশ

১৪

ইউনূসকে হেনস্তার সম্পূর্ণ দায় শেখ হাসিনার : জামায়াত আমির

১৫

সোনারগাঁয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার – ৩৫

১৬

৩৩ হাজার মণ্ডপে তিন স্তরের নিরাপত্তা

১৭

সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, পর্যটকদের ফেরার নির্দেশ

১৮

ন্যাটোর আদলে সক্রিয় মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি

১৯

জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

২০