নিউজ ডেস্ক
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ৫:০৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

‘সাইবার নিরাপত্তা বিল’ সংসদে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে সাইবার জগতের নিরাপত্তায় নতুন আইন করতে একটি বিল সংসদে উঠেছে।

মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) সংসদের এ সংক্রান্ত ‘সাইবার নিরাপত্তা বিল, ২০২৩’ উত্থাপন করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। পরে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পাঁচ দিনের সময় দিয়ে সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। এর আগে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্ত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

বিলটি উত্থাপনের শুরুতেই জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম আপত্তি জানিয়ে বলেন, অংশীজনরা এই বিলের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের মৌলিক কোনও পার্থাক্য নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনকে টিআইবি কালো আইন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

তিনি আরও বলেন, মানুষের মৌলিক অধিকার যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বন্ধের উপাদান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ছিল, খসড়া আইনেও রাখা হয়েছে। অনেকেই এই খসড়া আইনকে নিবর্তনমূলক বলে মনে করছেন।

জবাবে প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাইবার জগতে ঝুঁকিও বাড়ছে। সাইবার অপরাধগুলো এত বেশি মারাত্মক, এত বেশি জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, অর্থ ও উপাত্ত সুরক্ষণের জন্য এটা এত বেশি প্রয়োজন, যার ফলে ২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন প্রণয়ন করা হয়।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রয়োজন, সময়ের চাহিদা বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টার পরামর্শে, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, আইনমন্ত্রী সময়ে সময়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জাতীয় পর্যায়ের সংবাদ মাধ্যম, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সংস্থা, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সাইবার সিকিউরিটি আইনটি উত্থাপন করা হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে যেগুলো অজামিনযোগ্য ছিল সেখানে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। চারটি ধারা শুধু অজামিন যোগ্য হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটিকে ‘উদার’ ও ‘ভবিষ্যতমুখী’ বলেও উল্লেখ করেন পলক।

আইন নিয়ে আপত্তি:
আইনটির খসড়া প্রকাশের পর থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন বলে আসছে, সাইবার নিরাপত্তা আইনেও কার্যত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মূল বিষয়বস্তু বহাল রাখা হচ্ছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতোই এই আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা ব্যক্ত করে তারা বলছেন, প্রস্তাবিত আইনে কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো ও জামিনযোগ্য ধারা বাড়ানো হলেও অপরাধের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। ফলে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ থেকেই যাবে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের পর্যালোচনায় বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৫ (মিথ্যা বা আপত্তিকর তথ্য প্রকাশ), ধারা ২৯ (মানহানিকর তথ্য প্রকাশ) এবং ধারা ৩১ (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর শাস্তি) সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় অবিকৃত রয়েছে। ২৫ ধারায় ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও সুনাম ক্ষুণ্ন’ সংক্রান্ত কোনও ব্যাখ্যা না থাকায় এর অপব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে।

কী কী আছে আইনে:
বিলের ৪২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন যে, কোনও স্থানে এই আইনের অধীনে কোনও অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাহলে সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছে ফেলা, পরিবর্তন হওয়ার বা করার সম্ভাবনা রয়েছে তাহলে তার কোনও পরোয়ানা ছাড়াই সেখানে তল্লাশি, সরঞ্জাম জব্দ, দেহ তল্লাশি এবং পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারের এখতিয়ার রয়েছে। এই ধারাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও ছিল।

বিলের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনও প্রকার প্রোপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে তা হবে অপরাধ। এর সাজা হবে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড। বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে সাজা হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ৩ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড।

বিলের ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এরূপ কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে তা হবে অপরাধ। এর সাজা সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড। বিদ্যমান আইনে এই অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড।

বিলের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে পেনাল কোডের ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে সেজন্য ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

এই ধারা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের আপত্তি রয়েছে। সাংবাদিক নেতারা বলেছেন, ফৌজদারি কার্যবিধিতে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একই অপরাধের বিচার এই আইনের মধ্যে যুক্ত করার কারণে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে হয়রানির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিলের ৩১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি বা ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এই রকম কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক বল সম্প্রীতি বিনষ্ট করে যা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা এরকম ঘটার উপক্রম হয়, তা হলে ওই ব্যক্তির এরকম কাজ হবে একটি অপরাধ। এর সাজা সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড।

বিলের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতাভুক্ত কোনও অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করতে সহায়তা করেন, তা হলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অজামিনযোগ্য ১৪টি ধারার মধ্যে ১৮ (১) (খ), ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৪৬ ধারা জামিনযোগ্য করা হয়েছে। অজামিনযোগ্য চারটি ধারা হলো ১৭, ১৯, ২৭ ও ৩৩। নতুন করে জামিনযোগ্য করা ২১ ধারায় সাজা কমিয়ে ৭ বছর করা হয়েছে। তবে অর্থদণ্ড সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা আগের মতোই রাখা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এই ধারায় সাজা ছিল সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। এ ছাড়া ৩০ ধারায় আইনবহির্ভূতভাবে ‘ই-ট্রানজেকশন’ (ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে লেনদেন) সংক্রান্ত অপরাধ ও সাজার কথা বলা আছে।

প্রস্তাবিত আইনে অজামিনযোগ্য ধারা ছিল ৬টি। এখন দুটি ধারা নতুন করে জামিনযোগ্য করায় অজামিনযোগ্য ধারা রয়েছে ৪টি। এর মধ্যে ১৭ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বেআইনি প্রবেশসংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ডের কথা রয়েছে। ১৯ ধারায় কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদির ক্ষতিসাধন, ২৭ ধারায় সাইবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ৩৩ ধারায় হ্যাকিং–সংক্রান্ত অপরাধের কথা বলা হয়েছে।

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত করে ৭ আগস্ট অনেকটা আকস্মিকভাবে সাইবার নিরাপত্তা আইন নামে নতুন একটি আইন করার কথা জানায় সরকার। ওই দিনই প্রস্তাবিত আইনের খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। অবশ্য মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল নয়, পরিবর্তন করা হচ্ছে।

আইনমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের এক দিন পর ৯ আগস্ট তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীন ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সির’ ওয়েবসাইটে প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রকাশ করে সরকার। ২৮ আগস্ট মন্ত্রিসভায় খসড়া আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। খসড়া আইনটিতে অংশীজনদের মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে সমালোচনার মুখে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, বিল পাসের আগে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার সুযোগ দেওয়া হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিচার চলবে:
এর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার জাতীয় সংসদে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করেছিল। শুরু থেকেই এই আইন নিয়ে সাংবাদিকদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও এই আইনের বিভিন্ন ধারা নিয়ে বেশ কয়েকবার আপত্তি তোলা হয়েছিল। দেশ–বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তে সাইবার নিরাপত্তা আইন করতে যাচ্ছে। যদিও ডিজিটাল আইনের বেশির ভাগ ধারার বিষয়বস্তু অনেকটা অবিকৃতভাবে প্রস্তাবিত আইনে রেখে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তন বলতে জামিনযোগ্য ধারা বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সাজা কমানো হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত হলেও এই আইনে করা মামলাগুলোর বিচার নতুন আইনে হবে না, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেই হবে।

সম্পাদকদের প্রতিবাদ:
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের চরিত্রগত পার্থক্য না থাকলে শুধু নাম বদল করে নতুন আইন করা হবে অর্থহীন বলে মনে করে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। ৯ আগস্ট এক বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ বলে, প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনও যেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে জন্য এটি চূড়ান্ত করার আগে সংবাদমাধ্যমের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকার যেহেতু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেহেতু এই আইনে করা মামলাগুলো প্রত্যাহার এবং এই আইনে যারা ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেছেন, তাদের মুক্তি দেওয়া হোক।

প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনে কেবল মোড়ক পরিবর্তন করা হয়েছে বলে মনে করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান খসড়া আইনটিকে কালো আইন হিসেবে অভিহিত করে পুনঃবিবেচনার জন্য মন্ত্রিসভায় ফেরত পাঠাতে সংসদের কাছে দাবি জানান।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

Incredibili_strategie_e_bonus_esclusivi_con_vivabet_casino_per_appassionati_del

Increíble_oportunidad_para_entender_el_funcionamiento_de_bet_label_casino_y_max

Magas Retenció: Ingyenes Forgások és Cashback a Kaszinóban

Ліцензування та регуляція SuperGra casino в Україні

Spellen uitgesloten van de Winoui bonus : la liste définitive des jeux exclus

Jak Vkládat Peníze do SlotRave

Как 1win поддерживает ответственные игровые практики

Наиболее прибыльные игры в онлайн казино Пинко

Наиболее прибыльные игры в онлайн казино Пинко

Исследование 1xBet вход с временного адреса для безопасного доступа

১০

Exploring Themed Slots at the Best Online Casino

১১

Exploring Slot RTP & Volatility at Caswino Casino

১২

Content Review 450-341677-45654d42a458

১৩

Выгода или разочарование? Насколько выгодные условия предлагает мостбет игрокам?

১৪

Выгода или разочарование? Насколько выгодные условия предлагает мостбет игрокам?

১৫

Podsumowanie Kasyno Online Blik i Rekomendacje dla Graczy

১৬

Plinko Casino Deutschland

১৭

Globale Perspektiven auf Sicherheitsaspekte bei Sportwetten ohne Oasis

১৮

Globale Perspektiven auf Sicherheitsaspekte bei Sportwetten ohne Oasis

১৯

Migliori casino non AAMS: metodi di pagamento accettati

২০