আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হচ্ছে খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ রাজনৈতিক অধ্যায়

News Editor
মে ১৩, ২০২৬ ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দেশের মাধ্যমিক স্তরের ‘ইতিহাস’ ও ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ (বিজিএস) বইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২৭ সালের শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে এই পরিমার্জন করা হচ্ছে। এতে প্রথমবারের মতো বিশদভাবে যুক্ত হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯০-পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা। বিশেষ করে, ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে তার রাজনৈতিক অবদান এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ইতিহাস শিক্ষার্থীরা বইয়ে পড়তে পারবে।

নতুন ধারাবাহিকতায় পাঠ্যবইয়ে স্থান পাচ্ছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এছাড়া, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, পটভূমি এবং এর প্রভাবকেও নতুন বইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন প্রজন্মকে দেশের প্রকৃত ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই সংস্কার।

নতুন পাঠ্যবইয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯০-পরবর্তী ‘আপসহীন’ রাজনৈতিক ভূমিকা এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার অবদান বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্রাট গোপাল থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান, মাওলানা ভাসানী এবং শেরে বাংলার মতো ১০-১২ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের জীবনী ও অবদান নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে

তাদের মতে, পাঠ্যসূচিতে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত, আংশিকভাবে উপস্থাপিত কিংবা বিতর্কিত ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোকে নতুনভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। নতুন প্রজন্মকে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা সম্পর্কে আরও বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা দিতেই এই পরিমার্জন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই সংস্কারের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা। বিশেষ করে তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে যে রাজনৈতিক পরিচয়ে দেশে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেই অধ্যায়টি নতুন বইয়ে আলাদা অংশ হিসেবে স্থান পাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিভিন্ন পর্যায়ে তার ভূমিকা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এ সংক্রান্ত বিষয়বস্তু প্রণয়ন ও সম্পাদনার কাজ চলমান রয়েছে।

দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এর ঐতিহাসিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট শিক্ষার্থীদের জন্য নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, অংশগ্রহণ এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে সমসাময়িক ইতিহাসের অংশ হিসেবে বইয়ে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান দেওয়া হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তবধর্মী ধারণা দেবে

একই সঙ্গে দীর্ঘদিন আলোচনার বাইরে থাকা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহও নতুন পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিত এই দিনটির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হওয়া সত্ত্বেও ৭ নভেম্বর দীর্ঘ সময় পাঠ্যসূচিতে অনুপস্থিত ছিল, তাই এবার একে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়াও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানও নতুন পাঠ্যবইয়ে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ের এই আন্দোলনের পটভূমি, ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ, গণদাবি এবং এর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের একটি বাস্তবধর্মী ধারণা দিতেই এই উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

বিজিএস বইয়ে বড় পরিবর্তন : ফিরছেন ইতিহাসের ১০-১২ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রচলিত ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ (বিজিএস) বইয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। শিক্ষার্থীরা যেন প্রাচীন বাংলা থেকে আধুনিক বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, সেই লক্ষ্যেই বইটিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে নতুন বিষয়বস্তু সংযোজন, ভাষা পরিমার্জন এবং অধ্যায়গুলোর পুনর্বিন্যাস করা হবে।

এনসিটিবি পাঠ্যবইয়ের ভাষা সহজবোধ্য ও প্রাঞ্জল করার মাধ্যমে শিক্ষার কাঠিন্য কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মুখস্থনির্ভর চাপের বদলে ‘লার্নিং জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষার ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক তথ্য বাদ দেওয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পরিমার্জন শেষ করে জানুয়ারিতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বস্তুনিষ্ঠ ও শিক্ষার্থীবান্ধব বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে থাকছে একটি বিশেষ অধ্যায়, যেখানে ১০ থেকে ১২ জন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনী, কর্ম এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান তুলে ধরা হবে। প্রাচীন বাংলার পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট গোপাল থেকে শুরু করে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া, সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ আরও কয়েকজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের অবদানও নতুন বইয়ে স্থান পাবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই ইলিয়াস শাহী আমল থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব ও তাদের অবদানগুলোকে যথাযথ মূল্যায়নের আওতায় আনা হচ্ছে।

গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষার কাঠিন্য হ্রাস ও ‘লার্নিং জয়’ ধারণা

শুধু ইতিহাসের নতুন তথ্য সংযোজনই নয়, পাঠ্যবইয়ের ভাষা ও উপস্থাপন পদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে এনসিটিবি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে অনেক বইয়ের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের তুলনায় অতিরিক্ত জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে এবং বইভিত্তিক শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই ২০২৭ সালের নতুন শিক্ষাক্রমে বইয়ের কাঠিন্য কমিয়ে আরও সহজবোধ্য, প্রাণবন্ত ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ‘লার্নিং জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষার ধারণাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সরকারের নির্দেশনায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর চাপের মধ্যে না থেকে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারবে। টিচার্স গাইড, কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং পাঠ উপস্থাপনেও সেই অনুযায়ী পরিবর্তন আনার চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বইয়ের ভাষা আরও প্রাঞ্জল ও বাস্তবধর্মী করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, এই সংস্কারের মাধ্যমে পাঠ্যবই থেকে অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় অনেক বিষয় বাদ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসের যেসব অধ্যায় নিয়ে বিতর্ক বা বিকৃতির অভিযোগ ছিল, সেগুলোও নতুনভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এনসিটিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তারা এমন একটি ইতিহাস বই তৈরি করতে চান যা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করবে না; বরং বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে নির্মিত হবে। শিক্ষার্থীদের সামনে দেশের প্রকৃত ইতিহাস ও বরেণ্য ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের পরিচয় তুলে ধরাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে নতুন বই : এনসিটিবি সদস্য

সার্বিক বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম মাসুদুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ পুরোদমে চলছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের ‘ইতিহাস’ এবং ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো ডিসেম্বরের মধ্যেই পরিমার্জিত এই বইগুলোর কাজ সম্পন্ন করা, যাতে শিক্ষার্থীরা জানুয়ারিতেই নতুন বই হাতে পেয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আনন্দময় ও সহজবোধ্য করতে ‘লার্নিং জয়’ বা আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের অপ্রয়োজনীয় কাঠিন্য কমিয়ে সেগুলোকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যেন শিক্ষার্থীরা পড়ার চাপে পিষ্ট না হয়ে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।