বাংলাদেশে এখন ভয়াবহ হামের মহামারি চলছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ২৫০-এরও বেশি মানুষ। মৃতদের বেশিরভাগই ছোট শিশু। এতে দেশের হাসপাতালগুলোতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতাল শিশুতে ভরে গেছে। বেড সংকটে কাউকে কাউকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের বিপ্লবের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন থেকেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দেয় এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে যায়।
ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। বাংলাদেশে সংস্থাটির প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, তিনি বারবার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী স্বাস্থ্যমন্ত্রী নুরজাহান বেগমকে তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের দোহাই… এটা করবেন না।’
দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। টিকার সরবরাহ শেষ হয়ে যায়। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইটে এই তথ্য প্রকাশের পর পরেই সরিয়ে নেওয়া হয়।
এ বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে রোহিঙ্গা শিবিরে প্রথম প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। এরপর দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হাম ছড়িয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২১ হাজারেরও বেশি রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২৩ এপ্রিল সতর্ক করেছে, রোগটি মিয়ানমার ও ভারতেও ছড়িয়ে পড়ার ‘উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি’ আছে।
আইইডিসিআরের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘টিকার ঘাটতির বাইরেও বাংলাদেশের হামের সংকট দেশের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।’ তিনি সরকারকে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটি ইতিমধ্যেই একটি জরুরি অবস্থা। তাহলে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে দেরি কেন?’
নতুন সরকার এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু করেছে। ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জরুরি টিকা দেওয়া শুরু হয়। ২০ এপ্রিল সারা দেশে এই অভিযান ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তবে রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমেদ সতর্ক করে বলেছেন, এই গতিতে টিকা দিলে মহামারি দ্রুত থামবে না। তিনি বলেছেন, ‘এই হারে টিকা দিলে এখনই সংক্রমণ কমবে না।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সায়েদুর রহমান বলেছেন, পুরনো টিকা কেনার ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করা দরকার ছিল কারণ এটি জরুরি পরিস্থিতির জন্য তৈরি আইনি ধারার উপর নির্ভর করত। তিনি বলেছেন, ‘হামের মতো সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু হৃদয়বিদারক। এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। যে পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা।’
সূত্র– সায়েন্স ম্যাগাজিন