সরকার গঠনের মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকালে রাজধানীর বনানীস্থ টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করে উপস্থিত সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। মঞ্চে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন কমিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। এরপর পরিবেশন করা হয় বিএনপির দলীয় সংগীত ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’। এ সময় প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত সবাই হাততালি দিয়ে সংগীতের সঙ্গে তাল মেলান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ সচিব ড. আবু ইউসুফ।
এদিন সকাল থেকেই টিঅ্যান্ডটি মাঠে জড়ো হন নিম্ন আয়ের বহু মানুষ। তাদের অনেকের মুঠোফোনে এরই মধ্যে সরকারি সহায়তার টাকা জমা হওয়ার বার্তা পৌঁছে গেছে। ঈদের আগে রাষ্ট্রীয় অর্থ সহায়তা পেয়ে অনেকের চোখে-মুখে ছিল আনন্দের অশ্রু। কেউ এই টাকায় ওষুধের খরচ মেটানোর স্বপ্ন দেখছেন, কেউবা ভাবছেন কিছুটা সঞ্চয়ের কথা।
উদ্বোধনের আগেই উপকারভোগীদের মোবাইল ফোনে টাকা পৌঁছে গেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাধারণত পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য একটি কার্ড দেওয়া হবে। তবে বড় বা যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে কার্ড সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে উপকারভোগীরা মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন। পরে নগদ সহায়তার পরিবর্তে সমমূল্যের খাদ্যপণ্য দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের দাবি, নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এই কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পাইলট পর্যায়ে সারাদেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, আবাসন এবং জীবনযাত্রার মান যাচাই করে একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা হয়েছে। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ (পিএমটি) সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দারিদ্র্যের সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাচাই-বাছাই শেষে ডাবল ডিপিং (একাধিক ভাতা গ্রহণ), সরকারি চাকরি বা পেনশন সুবিধা পাওয়া পরিবারগুলো বাদ দিয়ে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে এই সহায়তার জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডগুলো হবে আধুনিক ও নিরাপদ প্রযুক্তিনির্ভর। এতে স্পর্শবিহীন (কন্টাক্টলেস) চিপ, কিউআর কোড এবং এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। জি-টু-পি (গভর্নমেন্ট টু পার্সন) পদ্ধতিতে ভাতার অর্থ সরাসরি উপকারভোগী নারীর ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ওয়ালেটে জমা হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা অর্থ লোপাটের সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছে সরকার।
স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কিছু কঠোর নীতিমালাও নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলে, এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলে কিংবা পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র ও বিলাসবহুল সম্পদ (যেমন গাড়ি বা এসি) থাকলে সেই পরিবার এই সুবিধা পাবে না।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এই পাইলট প্রকল্পের জন্য মোট ৩৮ কোটি সাত লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৬ দশমিক ০৬ শতাংশ অর্থ সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে বিতরণ করা হবে এবং বাকি অর্থ কার্ড তৈরি ও প্রযুক্তিগত সিস্টেম উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
এ সংক্রান্ত বিস্তারিত গাইডলাইন ইতোমধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
