সাগরকন্যা বরগুনার স্নিগ্ধ সকালে আজ যেন এক অদ্ভুত স্থবিরতা। যে চাকাগুলো প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে সচল রাখে, হঠাৎ করেই যেন তাতে মরিচা ধরেছে। শহরের রাজপথে নেই চিরচেনা ব্যস্ততা, বরং তার জায়গা দখল করেছে একরাশ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। কারণ একটাই জ্বালানি শূন্যতা। পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র সংকটে থমকে গেছে বরগুনার যাপিত জীবন।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সদর উপজেলার একমাত্র জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এস অ্যান্ড বি ফিলিং স্টেশন। প্রতিদিন যেখানে গাড়ির হর্নে মুখরিত থাকে চারপাশ, সেখানে দুই দিন ধরে ঝুলছে একটি বোবা সাইনবোর্ড ‘অকটেন নেই, পেট্রোল নেই’। এই কয়েকটি শব্দ যেন আছড়ে পড়ছে খেটে খাওয়া মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মোটরসাইকেল ও ছোট-বড় যানের চালকরা একবুক আশা নিয়ে পাম্পে ছুটে আসছেন, পাম্পে এসে পড়তে হয় লম্বা লাইনের বিড়ম্বনায়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চালকরা কারণ সর্বোচ্চ তিন শত টাকার তেল নিতে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা লম্বা লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হয়।
জীবিকার তাগিদে পথে নামা খসরু নামের এক চালক হতাশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলেন, “শহরের অলিতে গলিতে ঘুরেছি এক ফোঁটা তেলের আশায়। কোথাও না পেয়ে শেষে পাম্পে এলাম, এখানেও সেই একই শূন্যতা দীর্ঘ লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তার পরেও তেল পাবো কিনা নিশ্চিত নয়।
আরেক চালক মো. মামুনের চোখেমুখে রাজ্যের অন্ধকার। তিনি বলেন, “এই গাড়ির চাকার সাথেই আমার পরিবারের হাঁড়ির সম্পর্ক। প্রতিদিন ৫০০ টাকার তেল লাগে, অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে ১০০ বা ২০০ টাকার বেশি তেল জুটছে না। আজ তো পুরোটাই অমাবস্যা। এভাবে চললে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।” আরেক আরোহী রিপন মালিও জানালেন গত এক সপ্তাহ ধরে চলা তার অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা।
শূন্য দোকানে খুচরা বিক্রেতাদের অপেক্ষা সংকটের এই ঢেউ আছড়ে পড়েছে খুচরা বিক্রেতাদের দোকানেও। সরবরাহ না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা ব্যবসা বন্ধ রেখেছেন। কেওরাবুনিয়া এলাকার ‘নার্গিস স্টোর’-এর স্বত্বাধিকারী নার্গিস সুলতানা আক্ষেপ করে বলেন, “এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তেলের ড্রামগুলো খাঁ খাঁ করছে। প্রতিদিন যোগাযোগ করছি, কিন্তু কবে এই খরা কাটবে, কেউ বলতে পারছে না।” একই এলাকার ‘তামিম স্টোর’ এর বিক্রেতা শারমিনের কণ্ঠেও একই সুর। পাম্প থেকে তেল না মেলায় তাদের ব্যবসাও এখন লাটে ওঠার উপক্রম
পুরো শহর যখন জ্বালানি তৃষ্ণায় ধুঁকছে, তখন এস অ্যান্ড বি ফিলিং স্টেশন যেন হয়ে উঠেছে মরুভূমির বুকে এক চিলতে মরূদ্যান। সেখানে সীমিত পরিসরে পাওয়া যাচ্ছে পেট্রোল। আর তাই, এক বা দুই লিটার তেলের আশায় সেখানে মানুষের ঢল নেমেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত মুখগুলো যেন এই সংকটের নীরব সাক্ষী।এস অ্যান্ড বি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রিপন কুমার ব্যাপারী এই সংকটের জন্য লজিস্টিক কারণকে দুষছেন। শুক্রবার ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকার কারণে এই শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। কিছু দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ক্ষীণ আশা প্রকাশ করলেও, কতটুকু সরবরাহ মিলবে তা নিয়ে তিনিও সন্দিহান অন্যদিকে, বরগুনা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, বরিশালের ডিপোতে কোনো সংকট নেই এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রশাসনের মনিটরিং টিম মাঠে রয়েছে। কোন অসঙ্গতি দেখলে ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বাস করেন। প্রশাসনের আশ্বাস আর বাস্তবের এই বিস্তর ফারাকের মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে বরগুনার সাধারণ মানুষ। যান্ত্রিক শহরের চাকা কবে আবার পূর্ণ গতিতে ঘুরবে, কবে কাটবে এই জ্বালানির হাহাকার সেই প্রতীক্ষায় এখন প্রহর গুনছে পুরো বরগুনাবাসী।
